রাশিয়ার আক্রমণাত্মক ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে: ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধানের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার
ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এখন এক নতুন এবং জটিল মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে, ঠিক তখনই ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। বিবিসি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে, রাশিয়ার আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বা 'Offensive Ability' কার্যত ভেঙে পড়েছে। তার মতে, রুশ বাহিনী এখন আর বড় ধরনের কোনো কৌশলগত বিজয় অর্জনের অবস্থানে নেই। এই মন্তব্যটি এমন এক সময়ে এল যখন ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে এবং ফ্রন্টলাইনে নতুন করে প্রতিরোধের কৌশল সাজাচ্ছে।
সাবেক এই শীর্ষ জেনারেলের মতে, রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম এবং জনবলের যে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা ক্রেমলিনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কারণে যুদ্ধের ময়দান এখন এতটাই স্বচ্ছ যে, কোনো পক্ষের পক্ষেই বড় ধরনের সৈন্য সমাবেশ বা অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে রাশিয়া তাদের প্রথাগত শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে এসে রক্ষণাত্মক অবস্থানে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি কেবল রণক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং যুদ্ধের পরিবর্তিত প্রযুক্তিগত প্রেক্ষাপটকেও তুলে ধরেছে।
{getToc} $title={Table of Contents}রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা হ্রাসের মূল কারণসমূহ
সাবেক সেনাপ্রধানের মতে, রাশিয়ার আক্রমণাত্মক ক্ষমতা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাশিয়ার আধুনিক ট্যাংক এবং আর্মার্ড ভেহিকেলের বিশাল মজুদ এখন তলানিতে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং কামিকাজে ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার হাজার হাজার সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে রাশিয়া এখন বাধ্য হয়ে তাদের পুরোনো আমলের টি-৫৫ বা টি-৬২ ট্যাংকগুলো ময়দানে নামাচ্ছে, যা আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে অত্যন্ত দুর্বল।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বা রসদ সরবরাহের ঘাটতি। যুদ্ধের শুরুর দিকে রাশিয়ার যে বিশাল লজিস্টিক চেইন ছিল, তা এখন ইউক্রেনের দূরপাল্লার হিমার্স (HIMARS) মিসাইল এবং ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সম্মুখ সমরে থাকা রুশ সৈন্যদের কাছে নিয়মিত খাবার, জ্বালানি এবং গোলাবারুদ পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। যখন একটি বাহিনীর রসদ সরবরাহের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন তাদের আক্রমণাত্মক ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই স্থবির হয়ে পড়ে।
ড্রোন ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের প্রভাব
সাক্ষাৎকারে জেনারেল বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান যুদ্ধটি আর কেবল মানুষের পেশিশক্তি বা কামানের গোলার লড়াই নয়। এটি এখন প্রযুক্তির লড়াই। ইউক্রেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কমান্ড সেন্টারগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। রাশিয়ার ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমগুলো ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলোকে জ্যাম করার চেষ্টা করলেও, ইউক্রেন প্রতিনিয়ত তাদের সফটওয়্যার আপডেট করে রাশিয়ার এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।
এই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ইউক্রেনকে একটি বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। রাশিয়ার যে কোনো বড় সৈন্য সমাবেশ ড্রোন ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাচ্ছে এবং তারা আক্রমণ শুরু করার আগেই ইউক্রেনীয় গোলন্দাজ বাহিনী তাদের ওপর আঘাত হানছে। ফলে রাশিয়ার 'সারপ্রাইজ অ্যাটাক' করার ক্ষমতা এখন শূন্যের কোঠায়।
ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ রণকৌশল এবং পশ্চিমাদের ভূমিকা
সাবেক সেনাপ্রধান ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী তবে সতর্ক। তিনি মনে করেন, রাশিয়ার আক্রমণাত্মক ক্ষমতা ভেঙে পড়ার অর্থ এই নয় যে যুদ্ধ এখনই শেষ হয়ে যাবে। বরং যুদ্ধটি এখন একটি 'পজিশনাল ওয়ারফেয়ার' বা স্থবির যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনকে এখন তাদের প্রতিরক্ষা দেয়াল আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং রাশিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
পশ্চিমা বিশ্বের সহায়তা নিয়ে তিনি বলেন, "ইউক্রেনকে কেবল টিকে থাকার জন্য নয়, বরং জেতার জন্য অস্ত্র দিতে হবে।" তিনি মনে করেন, পশ্চিমা দেশগুলো যদি সময়মতো এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং দূরপাল্লার মিসাইল সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তবে ইউক্রেন রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, দেরি করলে রাশিয়া তাদের ভেঙে পড়া সক্ষমতা পুনরায় গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে, তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির সামরিক বাজেটে। যদিও ক্রেমলিন দাবি করছে তাদের অর্থনীতি স্থিতিশীল, কিন্তু বাস্তবে রাশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কমছে এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করতে গিয়ে সামাজিক খাতগুলোতে বাজেট কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সাবেক জেনারেলের মতে, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ এই অসন্তোষ ভবিষ্যতে তাদের সামরিক অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
ঘটনার পটভূমি: কেন এই সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ?
গত কয়েক মাসে ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জেনারেল সিরস্কি দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল সাবেক শীর্ষ জেনারেলের প্রথম বড় কোনো আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকার। তার এই মন্তব্যগুলো কেবল রাশিয়ার দুর্বলতা তুলে ধরে না, বরং ইউক্রেনের বর্তমান নেতৃত্বের ওপর এক ধরনের চাপও সৃষ্টি করে। তিনি এমন এক সময়ে এই কথাগুলো বলছেন যখন ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আরও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র পাওয়ার জন্য লবিং করছে।
রাশিয়া সম্প্রতি খারকিভ অঞ্চলে একটি নতুন ফ্রন্ট খোলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে তারা বড় কোনো সাফল্য পায়নি। এই ঘটনাটি সাবেক জেনারেলের দাবিকে আরও জোরালো করে যে, রাশিয়ার আক্রমণাত্মক ক্ষমতা এখন কেবল ছোট ছোট স্থানীয় লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
এই সাক্ষাৎকারের পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ন্যাটোর সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই দুর্বলতা ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে ক্রেমলিন এই দাবিকে 'পাশ্চাত্যের প্রোপাগান্ডা' বলে উড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের 'স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন' পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে এবং তারা লক্ষ্য অর্জনে বদ্ধপরিকর।
"রাশিয়া এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে তারা কেবল তাদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তাদের বড় কোনো শহর দখল করার বা ইউক্রেনের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা এখন আর নেই। এটি ইউক্রেনের জন্য একটি বড় কৌশলগত বিজয়।" - সাবেক সেনাপ্রধান (বিবিসি সাক্ষাৎকারে)।
চীন এবং ভারতের মতো দেশগুলোও এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে রাশিয়ার আধিপত্য কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক দেশ এখন রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে পশ্চিমা বা নিজস্ব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ: সামনের দিনগুলো কেমন হবে?
সাবেক সেনাপ্রধানের এই বিশ্লেষণের পর প্রশ্ন উঠছে—তবে কি যুদ্ধ শেষের পথে? সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার আক্রমণাত্মক ক্ষমতা ভেঙে পড়া মানেই শান্তি নয়। রাশিয়া এখন তাদের দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তুলবে এবং ইউক্রেনকে ক্লান্ত করার চেষ্টা করবে। একে বলা হয় 'War of Attrition' বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ। ইউক্রেনকে এই ফাঁদ এড়াতে হলে প্রযুক্তিতে আরও উন্নত হতে হবে এবং পশ্চিমা সমর্থন বজায় রাখতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যদি পুতিন মনে করেন যে সামরিকভাবে তিনি আর এগোতে পারছেন না, তবে তিনি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে আসতে পারেন। তবে ইউক্রেনের দাবি স্পষ্ট—১৯৯১ সালের সীমান্ত অনুযায়ী সমস্ত অঞ্চল ফেরত দিতে হবে। এই দুই বিপরীতধর্মী অবস্থানের কারণে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেষ কথাঃ ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধানের এই বিশ্লেষণ বিশ্বকে রাশিয়ার সামরিক শক্তির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দিয়েছে। যদিও রাশিয়ার ভাণ্ডারে এখনো প্রচুর পরমাণু অস্ত্র এবং জনবল রয়েছে, কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে কেবল সংখ্যা দিয়ে জয় সম্ভব নয়—তা আজ প্রমাণিত। রাশিয়ার এই কৌশলগত স্থবিরতা ইউক্রেনকে এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কিয়েভ এই সুযোগকে কতটা কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভূমি সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারে। যুদ্ধের এই নতুন অধ্যায় কেবল ইউক্রেন বা রাশিয়ার নয়, বরং গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
তথ্যসূত্রঃ BBC
