রাশিয়ার আকাশে একাধিক সূর্য, সাখালিন অঞ্চলে দেখা গেল বিরল ‘সানডগ’ ঘটনা

রাশিয়ার আকাশে একাধিক সূর্য, সাখালিন অঞ্চলে দেখা গেল বিরল ‘সানডগ’ ঘটনা

রাশিয়ার আকাশে একাধিক সূর্য, সাখালিন অঞ্চলে দেখা গেল বিরল ‘সানডগ’ ঘটনা

সম্প্রতি রাশিয়ার সাখালিন অঞ্চলে ভোরের আকাশে দেখা গেছে এক ব্যাতিক্রমী ও বিস্ময়কর দৃশ্য। সকালে সূর্য উঠার সময় আকাশে একটির পরিবর্তে যেন দুইটি সূর্য একসাথে দৃশ্যমান হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায় আকাশের দুটি সূর্য একসাথে পাশাপাশি জ্বলছে। প্রথম দেখায় এটাকে অনেকে জ্যোতি বৈজ্ঞানিক অস্বাভাবিক কোন কিছু মনে করলেও পরবর্তীতে বিশ্বাস করা জানিয়েছেন যে এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা যার বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা রয়েছে।

{getToc} $title={Table of Contents}

আকাশে ঠিক কি দেখা গেছে

সাখালিন অঞ্চলের বিভিন্ন শহর ও উপকূলীয় এলাকায় ভোরের দিকে এই দৃশ্য লক্ষ্য করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভোরের সূচি সময় হওয়ার সময় পাশাপাশি দুইটা সূর্যকে একসঙ্গে দেখতে পান তারা। তবে দুইটা সূর্যের মধ্যে একটি তুলনামূলকভাবে কম আলোকিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের অবস্থান যখন পরিবর্তন হয় তখন আলোর তীব্রতা ও আকৃতিতেও সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আবহাওয়াবিদদের মতে এমন দৃশ্য সাধারণত পরিষ্কার আকাশ ও অত্যন্ত ঠান্ডা আবহাওয়ার সময় বেশি দেখা যায়।

সানডগ কি

এ ধরনের আলোর ঘটনা কে বলা হয় সানডগ প্যারহেলিয়া নামে পরিচিত। সানডে কে অনেক সময় “মক সান বা ভুয়া সূর্য” ও বলা হয়। কারণ এটি প্রকৃত সূর্যের পাশে অবস্থান করে এবং সূর্যের মতোই আলো প্রতিফলিত করে। এটাকে দেখতে বিরল ঘটনা বলে মনে হলেও এটি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি পরিচিত এবং অনেক দিনের গবেষিত অপটিক্যাল ঘটনা। বিশ্বজুড়ে শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোতে প্রতিবছরই কোন না কোন সময়ে এই সানডগ দেখা যায়।

{getCard} $type={post} $title={আরও পড়ুন}

সানডগের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সানডগ হলো আকাশে সূর্যের ডান ও বাম পাশে দেখা যাওয়া উজ্জ্বল আলোর দাগ, যা প্রকৃতির এক সুন্দর আলোক ঘটনা। এটি তখনই তৈরি হয়, যখন সূর্যের আলো খুব উঁচু আকাশে থাকা সিরাস মেঘের ভেতরের ছোট ছোট বরফকণার মধ্য দিয়ে যায়। এই বরফকণাগুলো সাধারণত ষড়ভুজ আকৃতির হয়। সূর্যের আলো এসব বরফকণার ভেতরে ঢুকে প্রতিসরণ ঘটে, অর্থাৎ আলো তার পথ পরিবর্তন করে। এই বিশেষ আকৃতির বরফকণার কারণে আলো সূর্য থেকে প্রায় ২২ ডিগ্রি দূরে বাঁক নেয়। ফলে সূর্যের ঠিক পাশে না থেকে একটু দূরে, ডান ও বাম দিকে সানডগ দেখা যায়। আলো ভাঙার সময় সূর্যের সাদা আলো বিভিন্ন রঙে ভাগ হয়ে যায়, তাই সানডগে হালকা লালচে ও নীলচে রঙও দেখা যেতে পারে। সাধারণত ঠান্ডা আবহাওয়ায় দেশগুলতে সকাল ও বিকেলের দিকে সূর্য নিচু অবস্থানে থাকলে সানডগ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

বরফকণার ভেতর দিয়ে আলো কীভাবে ভেঙে যায়

সূর্যের সাদা আলো যখন আকাশের উঁচুতে থাকা ছোট ছোট বরফকণার ভেতর দিয়ে যায়, তখন আলো সোজা পথে না গিয়ে একটু বাঁক নেয়। একে বলে আলো ভেঙে যাওয়া বা প্রতিসরণ। বরফকণার ভেতরে ঢোকার সময় আলো ধীরে চলে এবং বের হওয়ার সময় আবার গতি বদলায়। এই গতি বদলানোর কারণেই আলো তার পথ পরিবর্তন করে। সূর্যের আলো আসলে অনেক রঙের মিশ্রণ যেমন লাল, হলুদ, নীল ইত্যাদি। বরফকণার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিটি রঙ একটু একটু করে ভিন্ন পথে বাঁক নেয়। ফলে সাদা আলো ভেঙে আলাদা আলাদা রঙ দেখা যায়। এইভাবেই বরফকণার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আলো ভেঙে যায় এবং আকাশে রঙিন আলোর দাগ দেখা যায়।

সানডগে বিভিন্ন রঙ কেন দেখা যায়

সানডগে বিভিন্ন রঙ দেখা যায় কারণ সূর্যের আলো এক রঙের নয়। সূর্যের সাদা আলো আসলে অনেক রঙের মিশ্রণ। যখন এই আলো আকাশের অনেক উঁচুতে থাকা ছোট ছোট বরফকণার ভেতর দিয়ে যায়, তখন আলো ভেঙে যায়। বরফকণার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সব রঙ একইভাবে বাঁক নেয় না। লাল রঙ কম বাঁক নেয় আর নীল রঙ একটু বেশি বাঁক নেয়। এই ভিন্ন ভিন্নভাবে বাঁক নেওয়ার ফলে রঙগুলো আলাদা হয়ে চোখে পড়ে। তাই সানডগে লালচে, হলুদ বা নীলচে রঙ দেখা যায় এবং এটি দেখতে ছোট রঙিন আলোর দাগের মতো লাগে।

‘সানডগ’ নামের পেছনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

‘সানডগ’ নামটি বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি এসেছে মানুষের কল্পনা ও লোকবিশ্বাস থেকে। প্রাচীনকালে সূর্যের পাশে থাকা এই আলোক বিন্দুগুলোকে সূর্যের সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করা হতো। গ্রিক পুরাণে আকাশ দেবতা জিউসের সঙ্গে আকাশে চলমান আলোক সঙ্গীদের গল্প প্রচলিত ছিল। অনেক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হতো, এই আলোগুলো কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়। বৈজ্ঞানিক নাম ‘প্যারহেলিয়া’ গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘সূর্যের সঙ্গে থাকা’।

{getCard} $type={post} $title={আরও পড়ুন}

কখন ও কোথায় সানডগ দেখার সম্ভাবনা বেশি থাকে

সানডগ পৃথিবীর যেকোনো শীতপ্রধান অঞ্চলে দেখা যেতে পারে, তবে শর্ত হলো আকাশে বরফকণা থাকতে হবে এবং সূর্য দিগন্তের ওপরে থাকতে হবে। সাধারণত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়, যখন সূর্য আকাশে নিচু অবস্থানে থাকে, তখন এই দৃশ্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়। শীতকাল, পরিষ্কার আকাশ এবং তীব্র ঠান্ডা আবহাওয়া সানডগ দেখার জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এজন্য উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে, বিশেষ করে রাশিয়া, কানাডা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

শেষ কথাঃ যদিও একসময় সানডগকে রহস্যময় বা অলৌকিক হিসেবে ধরা হতো, আধুনিক বিজ্ঞান এই ঘটনার পূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছে। আইজ্যাক নিউটনের আলোর প্রতিসরণ সংক্রান্ত গবেষণার পর থেকেই আলোর আচরণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা স্পষ্ট হয়। তবুও, আকাশে একাধিক সূর্যের মতো আলো দেখা আজও মানুষকে বিস্মিত করে। এটি প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য, যা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা জানার পরও মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে।

বিশ্ব সংবাদ এ এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি, যাচাই-বাছাই করে সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মাধ্যমে আপনাদের পাশে থাকতে চাই। সংবাদটি ভালো লাগলে আপনার প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন। পরবর্তী সংবাদটি পড়ার আমন্ত্রণ রইল।


Previous Post Next Post