৭ অক্টোবরের হামলা ও ইসরায়েলি রাজনীতি: একটি জাতির গভীর বিভাজনের আখ্যান
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন নজিরবিহীন হামলা আধুনিক ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষত তৈরি করেছে। এই একটি দিন ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা ধারণা, সামাজিক সংহতি এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়েছে। তবে হামলার এক বছর পেরিয়ে যখন দেশটি প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন একটি বিস্ময়কর সত্য সামনে আসছে: ইসরায়েলের সমাজ আমূল বদলে গেলেও এর রাজনীতি যেন সেই পুরনো বৃত্তেই আটকা পড়ে আছে।
ইসরায়েলের ভোটাররা এখন এক কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া। অন্যদিকে রয়েছে একটি বিক্ষুব্ধ জনতা এবং সামরিক নেতৃত্ব, যারা এই ট্র্যাজেডির জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবকে দায়ী করছেন। এই নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং এটি ইসরায়েলের জাতীয় পরিচয় এবং নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের এক অগ্নিপরীক্ষা।
{getToc} $title={Table of Contents}নেতানিয়াহুর ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ইমেজের পতন ও নতুন বয়ান
কয়েক দশক ধরে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার মূল দাবি ছিল, তিনিই একমাত্র নেতা যিনি ইসরায়েলকে ইরান এবং তার প্রক্সি বাহিনীগুলোর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলা সেই দাবির মূলে কুঠারাঘাত করেছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠলেও, নেতানিয়াহু চতুরতার সাথে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।
নেতানিয়াহুর সমর্থকরা এখন এক নতুন বয়ান তৈরি করেছে। তারা দাবি করছে, ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল নয়, বরং এটি ছিল সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেলদের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বা চূড়ান্ত পর্যায়ের অবহেলা। এই বয়ানটি ইসরায়েলি সমাজের ডানপন্থী এবং কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের মতে, জেনারেলরা এবং গোয়েন্দা প্রধানরা নেতানিয়াহুকে অন্ধকারে রেখেছিলেন বলেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।
সামরিক বনাম রাজনৈতিক নেতৃত্ব: এক অসম লড়াই
ইসরায়েলের ইতিহাসে সামরিক বাহিনীকে সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)-এর প্রধানরা বারবার স্বীকার করেছেন যে তারা ৭ অক্টোবর দেশের মানুষকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু নেতানিয়াহু আজ পর্যন্ত সরাসরি নিজের দায় স্বীকার করেননি। এই বিষয়টি ইসরায়েলি ভোটারদের দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। এক পক্ষ মনে করে নেতানিয়াহুর পদত্যাগই এই সংকটের একমাত্র সমাধান, অন্য পক্ষ মনে করে যুদ্ধের মাঝপথে নেতা পরিবর্তন হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
বিভক্ত জনমত: অবহেলা নাকি ষড়যন্ত্র?
ইসরায়েলি ভোটারদের মধ্যে বিভাজন এখন এতটাই স্পষ্ট যে, এটি পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে কফি শপ পর্যন্ত বিস্তৃত। তেল আবিবের উদারপন্থী ভোটাররা মনে করেন, নেতানিয়াহু গত কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলের বিচার বিভাগকে দুর্বল করার যে চেষ্টা চালিয়েছেন, তার ফলে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল হয়ে পড়েছিল। তারা মনে করেন, হামাস যখন হামলার পরিকল্পনা করছিল, তখন নেতানিয়াহু ব্যস্ত ছিলেন নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে।
অন্যদিকে, জেরুজালেম এবং বসতি স্থাপনকারী এলাকাগুলোর ভোটারদের মনোভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা মনে করেন, ইসরায়েলের সেনাবাহিনী অনেক বেশি ‘উদার’ হয়ে গিয়েছিল এবং তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি নমনীয় নীতি গ্রহণ করেছিল। এই ভোটারদের কাছে নেতানিয়াহু এখনও একজন অপরিহার্য নেতা, যিনি বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন। তাদের মতে, জেনারেলরা যদি আরও কঠোর হতেন, তবে ৭ অক্টোবর কখনও ঘটত না।
জিম্মি সংকট ও রাজনীতির করুণ বাস্তবতা
হামাসের হাতে বন্দী ইসরায়েলি জিম্মিদের বিষয়টি এখন দেশটির রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। জিম্মিদের পরিবারগুলো প্রতিদিন রাস্তায় নামছে, সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে একটি চুক্তিতে আসার জন্য। কিন্তু নেতানিয়াহুর সরকারের ভেতরের কট্টরপন্থী অংশ, বিশেষ করে ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচ, যেকোনো ধরনের চুক্তির ঘোর বিরোধী। তাদের মতে, হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল না করা পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি বা জিম্মি বিনিময় হওয়া উচিত নয়।
"আমাদের প্রিয়জনরা গাজার সুড়ঙ্গে পচে মরছে, আর আমাদের সরকার ব্যস্ত রাজনৈতিক গদি রক্ষা করতে। ৭ অক্টোবরের ট্র্যাজেডি আমাদের এক করেছিল, কিন্তু রাজনীতি আমাদের আবার আলাদা করে দিচ্ছে।" — একজন জিম্মির আত্মীয়র বক্তব্য।
এই জিম্মি সংকট নেতানিয়াহুর জন্য এক দ্বিমুখী তলোয়ার। তিনি যদি চুক্তি করেন, তবে তার জোট সরকার ভেঙে পড়তে পারে। আর যদি চুক্তি না করেন, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তাকে গদিচ্যুত করতে পারে। এই দোটানাই বর্তমান ইসরায়েলি রাজনীতির আসল চিত্র।
আন্তর্জাতিক চাপ ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর আন্তর্জাতিক চাপের প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন ভোটারদের ভাবিয়ে তুলছে। জো বাইডেন প্রশাসন বারবার দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বললেও নেতানিয়াহু তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরায়েলি ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করে, আমেরিকার সমর্থন ছাড়া ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে না।
একই সাথে ইরান, হিজবুল্লাহ এবং হুতিদের হুমকি ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। ভোটারদের একটি অংশ মনে করে, এই চরম অস্থিরতার সময় একজন অভিজ্ঞ নেতার প্রয়োজন, তা তিনি যতই বিতর্কিত হোন না কেন। এই ‘ভয়ের রাজনীতি’ নেতানিয়াহুর টিকে থাকার বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক মন্দা ও যুদ্ধের ব্যয়
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধ ইসরায়েলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। হাজার হাজার রিজার্ভিস্ট সৈনিককে কাজে ফেরত পাঠাতে না পারা, পর্যটন খাতের ধস এবং উত্তর ও দক্ষিণ সীমান্ত থেকে বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে এক বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছে। নির্বাচনের প্রচারে এই অর্থনৈতিক সংকট একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
পটভূমি: কেন এই স্থবিরতা?
ইসরায়েলের রাজনৈতিক স্থবিরতার মূলে রয়েছে দেশটির সংসদীয় ব্যবস্থা। কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না, ফলে ছোট ছোট কট্টরপন্থী দলগুলোর ওপর নির্ভর করে জোট সরকার গঠন করতে হয়। ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ইসরায়েল টানা পাঁচটি নির্বাচন দেখেছিল মাত্র চার বছরের মধ্যে। হামলার পর আশা করা হয়েছিল যে জাতীয় ঐক্যের খাতিরে এই বিভাজন ঘুচবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আদর্শিক লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। ডানপন্থীরা আরও ডানে ঝুঁকেছে, আর বামপন্থীরা অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
ভবিষ্যৎ পথরেখা: কী হতে পারে আগামী নির্বাচনে?
আগামী নির্বাচনে ইসরায়েলের সামনে দুটি বিকল্প পথ খোলা আছে। প্রথমত, নেতানিয়াহু এবং তার কট্টরপন্থী মিত্রদের জয়লাভ, যা ইসরায়েলকে আরও বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে নিয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, একটি মধ্যপন্থী বা উদারপন্থী জোটের উত্থান, যারা সামরিক নেতৃত্বের সাথে সমন্বয় করে এবং আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে এগোবে।
তবে জনমত জরিপগুলো বলছে, কোনো পক্ষই নিরঙ্কুশ অবস্থানে নেই। ইসরায়েল সম্ভবত আবারও একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের দিকে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, ৭ অক্টোবরের মতো বিশাল ট্র্যাজেডিও ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে যথেষ্ট ছিল না।
শেষ কথাঃ ইসরায়েল এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ৭ অক্টোবরের ক্ষত এখনও দগদগে, গাজার যুদ্ধ এখনও চলমান, এবং জিম্মিরা এখনও ফেরেনি। এই পরিস্থিতিতে ভোট দেওয়া ইসরায়েলিদের জন্য কেবল রাজনৈতিক পছন্দ নয়, বরং এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সমাজ বদলে গেছে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে, কিন্তু রাজনীতি যদি সেই পুরনো কাদা ছোড়াছুড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ইসরায়েলের জন্য সামনের দিনগুলো আরও কঠিন হবে। নেতানিয়াহুর ভাগ্য এবং ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ এখন সাধারণ মানুষের ব্যালট বাক্সে বন্দী।
তথ্যসূত্রঃ The New York Times