ট্রাম্প-জেলেনস্কি দ্বন্দ্বে চরম সংকটে ইউক্রেন ও ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা

ট্রাম্প-জেলেনস্কি দ্বন্দ্বে চরম সংকটে ইউক্রেন ও ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা

ট্রাম্প-জেলেনস্কি দ্বন্দ্বে চরম সংকটে ইউক্রেন ও ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যকার প্রকাশ্য মতবিরোধ ও বাক্যবিনিময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কিয়েভের টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি ছিল ওয়াশিংটনের অবিচল সামরিক, আর্থিক ও গোয়েন্দা সহায়তা। তবে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যকার ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন এখন কেবল দুই নেতার অসন্তোষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি কিয়েভের যুদ্ধ সক্ষমতা এবং ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের ছায়া ফেলতে শুরু করেছে।

চলমান এই সংকট যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ওয়াশিংটন থেকে যে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল বা মাঠপর্যায়ের সহায়তা পাচ্ছে, তা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে, ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন ইউরোপীয় মিত্রদেরকেও এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যা সামাল দেওয়ার মতো সামরিক প্রস্তুতি বর্তমানে ব্রাসেলস বা অন্য কোনো ইউরোপীয় রাজধানীর নেই। দুই রাষ্ট্রনায়কের এই দ্বন্দ্ব কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে এখন গোটা বিশ্বজুড়ে তীব্র জল্পনা-কল্পনা ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

{getToc} $title={Table of Contents}

বাকযুদ্ধের নেপথ্য ও আস্থার তীব্র সংকট

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যকার অম্লমধুর সম্পর্কের ইতিহাস নতুন নয়। ২০১৯ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে যে প্রথম অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার মূলেই ছিল জেলেনস্কির সঙ্গে একটি বিতর্কিত ফোনালাপ। সেই থেকেই রিপাবলিকান শিবিরের একটি বড় অংশের মধ্যে জেলেনস্কি এবং ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের প্রতি ইউক্রেনের গভীর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে এক ধরনের সূক্ষ্ম ক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্পের বিভিন্ন জনসভা এবং সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনকে নিয়ে করা একের পর এক চাঁচাছোলা মন্তব্য সেই পুরোনো ক্ষতকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন যে তিনি ক্ষমতায় থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন। পাশাপাশি জেলেনস্কিকে তিনি "ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সেলসম্যান" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যিনি প্রতিবার ওয়াশিংটনে এসে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়ে ফিরে যান। জেলেনস্কিও পাল্টা বক্তব্যে ট্রাম্পের এই ধরনের যুদ্ধবিরতির দাবির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প সম্ভবত পুতিনের আগ্রাসী মনোভাব এবং যুদ্ধের সামগ্রিক বাস্তবতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছেন না। এই পাল্টাপাল্টি মন্তব্য দুই নেতার মধ্যে আস্থার প্রাচীর সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে।

ব্যক্তিগত বৈরিতা থেকে নীতিগত সংঘাত

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটি এখন আর কেবল দুই নেতার অহংবোধ বা ব্যক্তিত্বের সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দর্শনের সংঘাত। একদিকে জেলেনস্কি পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে ন্যাটোর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' মতবাদ দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সংঘাত থেকে ওয়াশিংটনকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার পক্ষে। এই মতাদর্শগত ফারাক জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের মধ্যকার দূরত্বকে এক অলঙ্ঘনীয় ফাটলে রূপ দিয়েছে।

ইউক্রেনের জন্য অপারেশনাল ও সামরিক সহায়তার ঝুঁকি

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত তিনটি প্রধান মার্কিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্র সরবরাহ, নিয়মিত গোলাবারুদের চালান এবং অত্যন্ত নির্ভুল রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান। ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অনীহা বা সামরিক বিমুখতা ইউক্রেনের সম্মুখ সারির ফ্রন্টলাইনে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মার্কিন সহায়তা ছাড়া কিয়েভ শুধু ইউরোপের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারবে না—এটি এখন সামরিক বিশেষজ্ঞদের একবাক্যের স্বীকারোক্তি।

মার্কিন কংগ্রেস ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সময়ে সহায়তা প্যাকেজ পাসে রিপাবলিকান বাধার মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের নেতিবাচক অবস্থান এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। ওয়াশিংটন যদি ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া সীমিত করে দেয় বা দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র (যেমন হিমার্স ও এটিএসিএমএস) সরবরাহ বন্ধ করে, তবে ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ অগ্রযাত্রা ঠেকানোর মতো ন্যূনতম শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলতে পারে।

গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে স্থবিরতার আশঙ্কা

যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ন্যাটোর, বিশেষ করে পেন্টাগনের নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য। রুশ সেনাবহরের গতিবিধি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগাম সংকেত এবং কমান্ড সেন্টারের অবস্থান চিহ্নিতকরণে পেন্টাগনের বিকল্প কিয়েভের নেই। সম্পর্কের অবক্ষয়ের কারণে যদি গোয়েন্দা সহায়তার গতি মন্থর হয়ে যায়, তবে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন প্যাট্রিয়ট) প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং রুশ বিমানবাহিনী অবাধে ইউক্রেনের শহরগুলোতে বোমাবর্ষণ করতে সক্ষম হবে।

গোলাবারুদ ও আকাশ প্রতিরক্ষার ঘাটতি

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী প্রতিদিন হাজার হাজার আর্টিলারি শেল ব্যবহার করে। ইউরোপের অস্ত্র কারখানাগুলো সম্মিলিতভাবে এখনও সেই পরিমাণ গোলাবারুদ উৎপাদন করতে পারছে না যা ইউক্রেনের প্রয়োজন। এই শূন্যস্থান এতদিন ওয়াশিংটনের সামরিক গুদাম থেকেই পূরণ হয়ে আসছিল। সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে যদি এই জোগান বন্ধ হয়ে যায়, তবে ইউক্রেনীয় সেনাদের ফ্রন্টলাইন থেকে পিছু হটা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও নিরাপত্তা সংকট

ট্রাম্প ও জেলেনস্কির সম্পর্কের অবনতিতে সবচেয়ে বেশি প্রমাদ গুনছে ইউরোপের দেশগুলো, বিশেষ করে পোল্যান্ড, বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহ, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে বুঝতে পারছে যে ওয়াশিংটন ছাড়া পুরো যুদ্ধের ব্যয়ভার কিংবা সামরিক সরঞ্জাম বহন করা তাদের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো যখন দেখছে যে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য নেতৃত্ব কিয়েভের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে, তখন তারা নিজেদের ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কায় পড়ে গেছে।

ইউরোপের শিল্প সক্ষমতা এখনও যুদ্ধকালীন উৎপাদনের গতি অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দা বিদ্যমান থাকায় ট্রাম্পের সম্ভাব্য শূন্যতা পূরণ করা এই দেশগুলোর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে ট্রাম্পের এই মনোভাব ইউরোপকে কার্যত একা ফেলে দেওয়ার নামান্তর।

ন্যাটোর ঐক্য এবং নেতৃত্বের সংকট

ট্রাম্পের এই অনমনীয় মনোভাব ন্যাটোর ৭ দশকের পুরনো একক নেতৃত্বের ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ট্রাম্প অতীতেও ন্যাটো মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট না বাড়ানোর কারণে তিরস্কার করেছেন। জেলেনস্কির সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য শত্রুতা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট করে তুলেছে। হাঙ্গেরির মতো রুশপন্থী দেশগুলো ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া বন্ধের দাবি তুলছে, যা জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল ধরাচ্ছে।

পটভূমি: দুই নেতার ঐতিহাসিক অসন্তোষ ও ভূরাজনৈতিক পট পরিবর্তন

এই সংকটের শিকড় প্রথিত রয়েছে বিগত কয়েক বছরের মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তৎকালীন সময়ে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। ট্রাম্পের দাবি ছিল, ইউক্রেনকে জো বাইডেন এবং তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেনের বিতর্কিত ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে হবে। জেলেনস্কি সেই রাজনৈতিক ফাঁদে পা দেননি, যার ফলে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসন প্রক্রিয়া গতি পেয়েছিল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে সেই থেকেই জেলেনস্কির প্রতি একধরনের স্থায়ী রাজনৈতিক অনীহা তৈরি হয়।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া যখন পূর্ণমাত্রায় ইউক্রেন আক্রমণ করে, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনের পাশে সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়ায়। জেলেনস্কিও কিয়েভের আত্মরক্ষার স্বার্থে বাইডেন প্রশাসনের নীতিকেই আকড়ে ধরেন। তবে ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনী দৌড়ে ট্রাম্পের উত্থান জেলেনস্কির কূটনৈতিক কৌশলে বড় ধাক্কা দেয়। জেলেনস্কি রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় দলের সাথেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেও ট্রাম্প শিবিরের তীব্র কট্টরপন্থী অংশের কাছে তিনি কার্যত 'ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক মিত্র' হিসেবেই চিহ্নিত থেকে যান।

আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ মতামত

এই নজিরবিহীন কূটনৈতিক দূরত্বের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউরোপের নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন, মার্কিন নেতাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বলি হতে পারে আন্তর্জাতিক সীমানার সার্বভৌমত্ব রক্ষার বৈশ্বিক নীতি।

"ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে যদি এই দূরত্ব স্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা মস্কোর জন্য সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক উপহার হবে। কোনো যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াই ক্রেমলিন এমন এক কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যাবে, যা যুদ্ধক্ষেত্রের ভারসাম্য চিরতরে বদলে দিতে পারে।"

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও সতর্ক করে দিয়ে বলছেন যে, ট্রাম্পের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি পুতিনকে উৎসাহিত করবে। তাদের মতে, ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে জোরপূর্বক দুর্বল অবস্থানে বসানোর যেকোনো মার্কিন চেষ্টা মূলত পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা বলয়কে সম্পূর্ণ ধসিয়ে দেবে।

"আমরা ইউক্রেনকে শুধু কিয়েভের সুরক্ষার জন্য সমর্থন করছি না, আমরা ইউরোপের পূর্ব সীমানা রক্ষা করছি। ওয়াশিংটন যদি তার হাত গুটিয়ে নেয়, তবে যুদ্ধের আগুন কাল বাল্টিক কিংবা পোল্যান্ডের দরজায় এসে পৌঁছাবে।"

সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পরিণতি ও ক্রেমলিনের কৌশলগত লাভ

ট্রাম্প-জেলেনস্কি সম্পর্কের ফাটলের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী পক্ষটি হলো মস্কো। ভ্লাদিমির পুতিন শুরু থেকেই হিসেব কষে আসছিলেন যে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ধৈর্য দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের পালাবদলে কিয়েভের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন একসময় ফিকে হয়ে আসবে। ট্রাম্প ও জেলেনস্কির প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ ক্রেমলিনের সেই দীর্ঘমেয়াদি ধারণাকেই সত্য প্রমাণ করতে চলেছে।

রাশিয়া ইতিমধ্যে তাদের যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে এবং মিত্র দেশগুলো থেকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সমর্থন কমিয়ে আনে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে ইউক্রেনকে হয়তো এমন এক অন্যায্য শান্তি চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করা হবে, যার ফলে কিয়েভকে তার বিপুল ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে রাশিয়ার হাতে সমর্পণ করতে হতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের জন্য এক মারাত্মক নজির স্থাপন করবে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য আগ্রাসী পরাশক্তিকেও প্রতিবেশী দেশের সীমানা দখলে উৎসাহিত করবে।

শেষ কথাঃ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যকার চলমান মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ কেবল দুজনের ব্যক্তিগত মতদ্বৈধতা নয়, বরং এটি সমসাময়িক ভূরাজনীতির এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণ। ট্রাম্পের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জেলেনস্কির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই যখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামগ্রিক পশ্চিমা নিরাপত্তা স্থাপত্য। মার্কিন সহায়তা স্থগিত হওয়া মানে কেবল ইউক্রেনের হার নয়, বরং ইউরোপের মাটিতে দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা নিরাপত্তার অলঙ্ঘনীয় ছাতা ভেঙে পড়া। আগামী দিনগুলোতে এই দুই নেতার মধ্যকার সম্পর্কের গতিপথই হয়তো নির্ধারণ করে দেবে ইউরোপের সীমানা কোথায় গিয়ে স্থির হবে এবং একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থা কার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে।

তথ্যসূত্রঃ The New York Times

Previous Post Next Post