জেলেনস্কির সঙ্গে দ্বন্দ্বের মাঝেই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেন ট্রাম্প
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তীব্র কূটনৈতিক মতবিরোধ ও প্রকাশ্য বাকযুদ্ধের মধ্যেই রাশিয়ার ওপর আরোপিত একাধিক কঠোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পাস করা মস্কোবিরোধী বিভিন্ন বিধিনিষেধ "জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের" কারণ দেখিয়ে শিথিল করার নির্বাহী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ওয়াশিংটনের এই নাটকীয় পদক্ষেপের ফলে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা সামরিক ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে গভীর ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউসের এই সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন নয়, বরং এটি ইউক্রেন সংকট নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। কিয়েভ প্রশাসনের সাথে ওয়াশিংটনের টানাপোড়েন যখন চরমে পৌঁছেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মস্কোর প্রতি এমন নমনীয় অবস্থান স্পষ্টতই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের সদস্য এবং ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে চরম অস্বস্তি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
{getToc} $title={Table of Contents}নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপট ও নির্বাহী পদক্ষেপ
সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে রাশিয়ার আগ্রাসী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে জ্বালানি খাত, আর্থিক লেনদেন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সাথে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ সংক্রান্ত একাধিক আইন পাস করা হয়েছিল। কংগ্রেসের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুতিন প্রশাসনের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। তবে মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের জন্য প্রদত্ত "জাতীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র" (National Security Waiver) সংক্রান্ত বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই বিধিনিষেধগুলোর একটি বড় অংশ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।
হোয়াইট হাউস থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে যে অতিরিক্ত এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা মস্কোর সাথে শান্তি আলোচনা শুরুর পথকে জটিল করে তুলছে। জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে প্রশাসন দাবি করেছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর মধ্যস্থতা চালাতে হলে ওয়াশিংটনের হাতে কূটনৈতিক নমনীয়তা থাকা আবশ্যক। নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে মস্কোকে কোণঠাসা করার পুরনো নীতি ফলপ্রসূ হয়নি বলেই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই বিকল্প কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের তীব্র মতবিরোধ
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের এই নাটকীয় সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক দৃশ্যত তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। যুদ্ধ বন্ধের উপায় এবং মার্কিন সহায়তা প্রদান নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছিল। বিশেষ করে ট্রাম্পের দ্রুত যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি এবং ইউক্রেনকে সহায়তার বিনিময়ে খনিজ সম্পদ ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
জেলেনস্কি একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন যে, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ড ছাড় দিয়ে রাশিয়ার সাথে কোনো আপস প্রস্তাব মেনে নেওয়া কিয়েভের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে জেলেনস্কির যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ওয়াশিংটনের শত শত কোটি ডলারের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এই মতপার্থক্য একপর্যায়ে তীব্র বাকযুদ্ধে রূপ নেয়, যার রেশ ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অনুমোদিত কঠোর পদক্ষেপ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
"জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যেকোনো সংঘাতের টেকসই সমাধান প্রয়োজন। অপরিকল্পিত নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় কূটনৈতিক আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দেয়, যা আমাদের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী।"
কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আইনসভার সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করছেন। ডেমোক্র্যাটদের মতে, যখন ইউক্রেন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই করছে, তখন আগ্রাসী রাশিয়ার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের পাস করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে গণ্য হবে।
শুধু বিরোধী ডেমোক্র্যাটরাই নয়, ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে থাকা কট্টর পররাষ্ট্রনীতি সমর্থক আইনপ্রণেতারাও এই পদক্ষেপে অস্বস্তিতে পড়েছেন। ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকানরা মস্কোর প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে। ফলে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের অনেক নেতা প্রশ্ন তুলছেন, কংগ্রেসের দ্বিদলীয় ঐকমত্যে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞা নির্বাহী আদেশে এড়িয়ে যাওয়া আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করবে কি না। কংগ্রেসে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
মস্কোর প্রতিক্রিয়া এবং কূটনৈতিক সুবিধা
ওয়াশিংটনের এই পরিবর্তনকে মস্কো খুব সতর্কভাবে কিন্তু ইতিবাচক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। ক্রেমলিন দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা অবৈধ এবং এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। মস্কোর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নমনীয়তা নির্দেশ করে যে ওয়াশিংটন বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করতে শুরু করেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার রাজনীতিতে তারা ক্লান্ত।
পুতিন প্রশাসন এই সুযোগকে কূটনৈতিক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। মস্কো মনে করছে, ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যকার দূরত্বের সুবিধা নিয়ে তারা যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অধিকতর অনুকূল শর্ত আদায় করতে সক্ষম হবে। তবে একই সাথে ক্রেমলিন অত্যন্ত ধীরেসুস্থে এগোচ্ছে, কারণ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো সাময়িক বা কৌশলগত চাপের অংশ হতে পারে বলেও মস্কোর নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করেন।
"মস্কোর বিরুদ্ধে যেকোনো অবৈধ নিষেধাজ্ঞার অবসান বৈশ্বিক বাণিজ্য ও স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। ওয়াশিংটনের যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।"
ইউরোপীয় মিত্রদের হতাশা ও পশ্চিমা ঐক্যে ফাটল
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্সসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, বিশেষ করে পোল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো, রাশিয়ার বিরুদ্ধে একাট্টা অবস্থান ধরে রাখার পক্ষপাতী। ওয়াশিংটন যদি মস্কোর বিরুদ্ধে একতরফাভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে শুরু করে, তবে ইউরোপের নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা কাঠামোও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছে।
ইউরোপের প্রধান রাজধানীগুলোতে ভয় বাড়ছে যে, মার্কিন নেতৃত্ব ছাড়া ইউক্রেনকে আর্থিক ও সামরিকভাবে টিকিয়ে রাখা ইউরোপের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এছাড়া ট্রাম্পের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে ট্রান্স-আটলান্টিক অংশীদারিত্বের যে ঐক্য গত তিন বছর ধরে বজায় ছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ব্রাসেলসের নীতিনির্ধারকরা এখন নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক প্রভাব ও চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক প্রভাব পড়তে বাধ্য। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, রাশিয়ার সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যাংক এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলো যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল, মার্কিন বিধিনিষেধ শিথিলের কারণে সেখানে কিছুটা ঢিলেঢালা ভাব আসতে পারে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, যারা রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য বজায় রাখতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল, তারা এখন নতুন উদ্যমে মস্কোর সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি করতে উৎসাহিত হতে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতায় এই পদক্ষেপ ইউক্রেনীয় বাহিনীর মনোবলকে প্রভাবিত করতে পারে। কিয়েভের আশঙ্কা, ওয়াশিংটনের চাপ শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে একটি অপমানজনক শান্তিচুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করার দিকে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনী তাদের সামরিক আধিপত্য বজায় রেখে আলোচনায় বসার বাড়তি আত্মবিশ্বাস পাবে। সামগ্রিকভাবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
শেষ কথাঃ ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই নাটকীয় পদক্ষেপ মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চরম বাস্তববাদী ও লেনদেনভিত্তিক (transactional) রূপকেই উন্মোচিত করেছে। জেলেনস্কির সাথে বিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মস্কোকে এই ধরনের কৌশলগত ছাড় দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবে, নাকি ইউরোপের নিরাপত্তা সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ওয়াশিংটনের এই একক সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক কূটনীতির সমীকরণকে এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ BBC