নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড: ট্রাম্পের লাইভস্ট্রিম বাতিলের সিদ্ধান্ত ও প্রেক্ষাপট

নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড: ট্রাম্পের লাইভস্ট্রিম বাতিলের সিদ্ধান্ত ও প্রেক্ষাপট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলার মূল হোতা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে এক নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রশাসন পূর্বে এই মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভস্ট্রিম করার কথা ভাবলেও, শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ড সরাসরি দেখা অনেকের জন্যই অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে, তাই তিনি এটি জনসম্মুখে বা লাইভস্ট্রিমে না দেখানোর পক্ষেই মত দিয়েছেন।

নিদাল হাসান, যিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন, ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা এবং ৩০ জনেরও বেশি মানুষকে আহত করেছিলেন। এই ঘটনার পর তাকে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এখন সেই দণ্ড কার্যকরের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত এবং ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

{getToc} $title={Table of Contents}

ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ও লাইভস্ট্রিম বাতিলের কারণ

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই অপরাধীদের প্রতি কঠোর দণ্ড প্রদানের পক্ষপাতী। তবে নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছেন সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়ে। ট্রাম্পের মতে, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে একজন মানুষের মৃত্যু সরাসরি দেখা সাধারণ মানুষের জন্য মানসিকভাবে ট্রমাটিক হতে পারে। তিনি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, "অনেকেই হয়তো এই দৃশ্যটি দেখতে চাইবেন না।" যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক সমর্থক চেয়েছিলেন এই বিচার প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার খাতিরে সরাসরি দেখানো হোক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানবিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার কথা বিবেচনা করে লাইভস্ট্রিম বাতিল করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক কৌশলও থাকতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। সরাসরি সম্প্রচার করলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তীব্র চাপের মুখে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। এছাড়া, নিদাল হাসানকে একজন 'শহীদ' হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পেতে পারত উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো। তাই লাইভস্ট্রিম বাতিল করে বিষয়টিকে একটি রুটিন সামরিক প্রক্রিয়া হিসেবে সম্পন্ন করতে চাইছে হোয়াইট হাউস।

ফোর্ট হুড হত্যাকাণ্ড: ২০০৯ সালের সেই কালো দিন

২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর। টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে তখন দুপুরের ব্যস্ততা। হঠাৎ করেই 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করেন মেজর নিদাল হাসান। তার লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত নিরস্ত্র সহকর্মী সেনারা। মাত্র কয়েক মিনিটের তাণ্ডবে ১৩ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন। এই হামলাটি ছিল মার্কিন ভূখণ্ডে কোনো সামরিক ঘাঁটিতে ঘটা সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ হামলা।

নিদাল হাসান পেশায় ছিলেন একজন সামরিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের মোতায়েনের বিরোধিতা করতেন তিনি। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, তিনি উগ্রপন্থী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এবং ইয়েমেনে অবস্থানরত আল-কায়েদা নেতা আনোয়ার আল-আওলাকির সাথে ইমেইলে যোগাযোগ রাখতেন। এই হামলাটি আমেরিকাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল কারণ হামলাকারী ছিলেন স্বয়ং সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

সামরিক আদালত ও দীর্ঘ আইনি লড়াই

২০১৩ সালে নিদাল হাসানের বিচার শুরু হয় একটি সামরিক আদালতে। বিচারের সময় হাসান কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করেননি, বরং তিনি গর্বের সাথে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি এই হামলা চালিয়েছেন। তিনি নিজেকে "ইসলামের যোদ্ধা" হিসেবে দাবি করেন এবং বলেন যে তিনি মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। সামরিক জুরি বোর্ড তাকে ১৩টি পরিকল্পিত হত্যা এবং ৩২টি হত্যার চেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বসম্মতিক্রমে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়।

তবে মার্কিন সামরিক বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। রায়ের পর থেকে হাসান গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আপিল করে আসছিলেন। মার্কিন সামরিক আইন অনুযায়ী, যেকোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য খোদ প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই অনুমোদন প্রদান করার মাধ্যমেই এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি টানতে যাচ্ছেন।

ফায়ারিং স্কোয়াড: একটি বিতর্কিত পদ্ধতি

নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে ফায়ারিং স্কোয়াড বা গুলি করে হত্যার মাধ্যমে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে বিষাক্ত ইনজেকশন (Lethal Injection) দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রচলন বেশি, সেখানে ফায়ারিং স্কোয়াডের ব্যবহার বেশ বিরল। তবে মার্কিন সামরিক আইনে এই পদ্ধতির বিধান রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ফায়ারিং স্কোয়াড বিষাক্ত ইনজেকশনের চেয়েও দ্রুত এবং কম যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়।

ফায়ারিং স্কোয়াড পদ্ধতিতে সাধারণত পাঁচজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শুটার থাকে, যাদের মধ্যে একজনের বন্দুকে ফাঁকা গুলি (Blank round) থাকে যাতে কেউ নিশ্চিত হতে না পারে যে কার গুলিতে মৃত্যু হয়েছে। নিদাল হাসানের ক্ষেত্রেও এই ঐতিহ্যবাহী সামরিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। তবে এই পদ্ধতিটি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। তারা একে "মধ্যযুগীয় এবং বর্বর" হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

৬০ বছর পর প্রথম সামরিক মৃত্যুদণ্ড: ঐতিহাসিক গুরুত্ব

মার্কিন সেনাবাহিনীতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। জন বেনেট নামক একজন সেনাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে গত ৬৩ বছরে অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তাই মার্কিন সামরিক বিচার বিভাগের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কোনো আপস করতে রাজি নয়। বিশেষ করে যখন বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত। এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, সেনাবাহিনীর ভেতরে থেকে কেউ যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা সন্ত্রাসবাদে লিপ্ত হয়, তবে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি ভোগ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার বিতর্ক

নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড এবং লাইভস্ট্রিম বাতিলের বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা মনে করে, অপরাধ যাই হোক না কেন, রাষ্ট্র কর্তৃক জীবন কেড়ে নেওয়া মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

"যেকোনো ধরণের মৃত্যুদণ্ডই অমানবিক। নিদাল হাসানের অপরাধ ভয়াবহ হলেও, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা আধুনিক বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।" - আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা।

অন্যদিকে, ফোর্ট হুড হামলায় নিহতদের পরিবার এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘ ১৫ বছর পর তারা ন্যায়বিচার পেতে যাচ্ছেন। নিহতদের স্বজনদের অনেকেরই দাবি ছিল যে, হাসানের মৃত্যুদণ্ড জনসম্মুখে কার্যকর করা উচিত ছিল যাতে বিশ্বের সকল সন্ত্রাসীর কাছে একটি কঠোর বার্তা যায়। তবে ট্রাম্পের লাইভস্ট্রিম বাতিলের সিদ্ধান্তকে তারা 'বিচক্ষণতা' হিসেবে দেখছেন যাতে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।

ট্রাম্পের কঠোর নীতি ও বিচারিক প্রভাব

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদের শুরু থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন। তার শাসনামলে ফেডারেল পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিদাল হাসানের মামলাটি তার সেই "Law and Order" বা আইন-শৃঙ্খলার কঠোর নীতিরই একটি প্রতিফলন। ট্রাম্পের সমর্থকরা মনে করেন, এই ধরণের কঠোর পদক্ষেপ সন্ত্রাসবাদ দমনে সহায়ক হবে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এই ধরণের স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোকে ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে বা ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে এই ধরণের সিদ্ধান্ত জনমতকে প্রভাবিত করার একটি চেষ্টা হতে পারে। যাই হোক না কেন, নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মার্কিন বিচারিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।

নিদাল হাসানের বর্তমান অবস্থা ও শেষ মুহূর্ত

বর্তমানে নিদাল হাসান কানসাসের ফোর্ট লিভেনওয়ার্থের সামরিক কারাগারে বন্দি রয়েছেন। ২০০৯ সালের সেই ঘটনার সময় পুলিশের গুলিতে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত (Paralyzed) হয়ে পড়েছিলেন, যার ফলে তিনি বর্তমানে হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন। তার শারীরিক অবস্থা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস বিবেচনায় নিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে সামরিক আইন অনুযায়ী, তার পক্ষাঘাত তার দণ্ড কার্যকরের পথে কোনো বাধা হবে না।

হাসানের আইনজীবীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই দণ্ড স্থগিত করার চেষ্টা করছেন। তারা দাবি করছেন যে, নিদাল হাসানের মানসিক অবস্থা স্থিতিশীল নয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সামরিক আইনের পরিপন্থী। কিন্তু আদালত এবং ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত সেই দাবিতে কর্ণপাত করেনি। সব ঠিক থাকলে খুব শীঘ্রই নির্ধারিত সময়ে তার দণ্ড কার্যকর করা হবে।

শেষ কথাঃ

নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক ঐতিহ্য এবং মানবিক মূল্যবোধের এক জটিল সংমিশ্রণ। লাইভস্ট্রিম বাতিলের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো একটি বড় ধরণের বিতর্ক এড়াতে চেয়েছেন, কিন্তু ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে এই দণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্তটি দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত হবে। ফোর্ট হুডের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য এটি শোকের অবসান এবং ন্যায়বিচারের প্রাপ্তি হলেও, মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ৬০ বছর পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই পদক্ষেপ আগামী দিনে দেশটির বিচার ব্যবস্থায় কী ধরণের পরিবর্তন আনে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্রঃ BBC

Previous Post Next Post