ভারতে গণআন্দোলনের ঐতিহ্য: হিন্দিবিরোধী লড়াই থেকে ঐতিহাসিক কৃষক বিক্ষোভ

ভারতে গণআন্দোলনের ঐতিহ্য: হিন্দিবিরোধী লড়াই থেকে ঐতিহাসিক কৃষক বিক্ষোভ

ভারতে গণআন্দোলনের ইতিহাস: অধিকার আদায়ের লড়াই ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পরিচিতি কেবল তার সুবিশাল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক চরিত্র ও সাংবিধানিক কাঠামো গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে গণআন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্যে। সম্প্রতি দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, তথাকথিত বেনামি ভোটার অন্তর্ভুক্তি এবং নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা পুনরায় ভারতীয় রাজপথকে প্রতিবাদমুখর করে তুলেছে। নাগরিক অধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যখন সরকারি নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন, তখন তারা ভারতের স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের ঐতিহাসিক প্রতিবাদী উত্তরাধিকার থেকেই শক্তি সঞ্চয় করছেন।

ভারতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশটির সামাজিক ন্যায়বিচার, যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারসাম্য এবং নীতি নির্ধারণের প্রতিটি বাঁক কোনো না কোনো গণবিক্ষোভের ফলেই নির্ধারিত হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন থেকে শুরু করে তামিলনাড়ুর হিন্দিবিরোধী আন্দোলন, সত্তরের দশকের জরুরি অবস্থাবিরোধী জেপি আন্দোলন, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী বিক্ষোভ এবং তিন বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন—প্রতিটি প্রতিবাদই প্রমাণ করেছে যে ভারতীয় গণতন্ত্র কেবল আইনসভার ভেতরে নয়, বরং রাজপথের প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই প্রাণবন্ত থাকে।

{getToc} $title={Table of Contents}

ভাষাগত পরিচয় ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর লড়াই: হিন্দিবিরোধী আন্দোলন

স্বাধীন ভারতের প্রথম বড় ধরনের গণবিক্ষোভের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল ভাষাগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে। ভারতীয় সংবিধান রচনার সময় হিন্দিকে একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে তৎকালীন মাদ্রাজ রাজ্যে (বর্তমান তামিলনাড়ু) তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। সি. এন. আন্নাদুরাই এবং দ্রাবিড় কাজাগাম আন্দোলনের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ কেবল ভাষার দাবি ছিল না, এটি ছিল উত্তর ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দক্ষিণ ভারতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও বহুত্ববাদী পরিচয়ের লড়াই।

১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে, যখন শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনার বিরুদ্ধে লাগাতার ধর্মঘট পালন করেন। রক্তাক্ত সংঘর্ষ, আত্মাহুতি এবং ব্যাপক জনবিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার নমনীয় হতে বাধ্য হয়। এর ফলেই প্রণীত হয় ১৯৬৭ সালের আনুষ্ঠানিক ভাষা সংশোধনী আইন, যার মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইংরেজিকে হিন্দিকে পাশাপাশি সহ-দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বহাল রাখা হয়। এই আন্দোলন ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা রক্ষার অনন্য মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: জয়প্রকাশ নারায়ণের জেপি আন্দোলন ও জরুরি অবস্থা

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে গণআন্দোলনের আরেকটি শক্তিশালী অধ্যায় রচিত হয়, যা ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার প্রধানতম পরীক্ষা ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্রমবর্ধমান একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিহার ও গুজরাট থেকে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রবীণ সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ (জেপি) এই আন্দোলনের হাল ধরেন এবং 'সম্পূর্ণ ক্রান্তি' বা সমগ্র বিপ্লবের ডাক দেন।

দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং শাসনতান্ত্রিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই সম্মিলিত প্রতিরোধ এতটাই তীব্র ছিল যে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ১৯৭৫ সালে দেশে কুখ্যাত অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি করে। মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয় এবং বিরোধী নেতাদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে সেই কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়। এই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করে দেয় যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন যতই গভীর হোক, ভারতীয় সমাজে স্বৈরতন্ত্রের শিকড় স্থায়ী হতে পারে না।

প্রান্তিক মানুষের পরিবেশ ও জীবন-জীবিকা রক্ষার আন্দোলন

ভারতের প্রতিবাদী ইতিহাস কেবল নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা জল, জঙ্গল এবং মাটির অধিকার রক্ষার লড়াইয়েও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ১৯৭০-এর দশকে হিমালয়ের পাদদেশে সংগঠিত 'চিপকো আন্দোলন' বন উজাড়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ নারীদের এক অভূতপূর্ব অহিংস প্রতিরোধের প্রতীক। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গাছ কাটার প্রতিবাদে গ্রামবাসীরা গাছের সাথে নিজেদের জড়িয়ে ধরেছিলেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ আন্দোলনের এক আদর্শ রূপরেখা তৈরি করে দেয়।

একইভাবে আশির দশকে শুরু হওয়া 'নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন' মেগা-উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের পুনর্বাসনহীন বাস্তুচ্যুতির বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই পরিচালনা করে। মেধা পাটকর এবং বাবা আমতের নেতৃত্বে এই আন্দোলন দেখিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংজ্ঞা কেবল বাঁধ বা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং তার কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য।

সমসাময়িক ভারতের রাজনৈতিক সংঘাত: শাহীন বাগ ও ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভারতের গণআন্দোলনের চরিত্র আরও প্রযুক্তিগত, সুসংগঠিত এবং বহুমুখী রূপ ধারণ করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে ২০১৯ সালের শেষভাগে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বিরোধী বিক্ষোভে। দিল্লির শাহীন বাগে মুসলিম নারী ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের দীর্ঘকালীন অবস্থান কর্মসূচি বৈষম্যহীন সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করে। তীব্র ঠান্ডা এবং প্রশাসনিক বাধার মুখেও কয়েক মাস ধরে চলা এই প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।

এর পরপরই ২০২০ সালের শেষভাগে ভারতীয় কৃষকরা কেন্দ্রের তিনটি বিতর্কিত কৃষি সংস্কার আইনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে তোলেন, তা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ গণপ্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত। পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তর প্রদেশের লাখ লাখ কৃষক দিল্লির প্রবেশদ্বারগুলোতে তাবু গেড়ে অবস্থান নেন। প্রায় এক বছর ধরে তীব্র শীত, মহামারি ও পুলিশের দমনপীড়নের মুখে তারা আন্দোলন জারি রাখেন। অবশেষে ২০২১ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে আইনগুলো প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তৃণমূল গণশক্তির সবচেয়ে বড় বিজয়।

"ভারতে গণআন্দোলন কোনো সাংবিধানিক সংকট নয়, বরং তা ভারতীয় সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক রক্ষাকবচ। যখন সংসদীয় বিতর্ক সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে গণমানুষের প্রকৃত সংসদ।"

বর্তমান সংকট: ভোটার তালিকা বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এবং নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকারের ওপর প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে। বিরোধী জোট এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ তুলছে যে বিভিন্ন রাজ্যে পদ্ধতিগত ভুলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নাগরিক সমাজ ও অ্যাক্টিভিস্টরা নতুন করে বিক্ষোভ ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন গড়ে তুলছেন।

এই চলমান প্রতিবাদের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস তাদের সামনে দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করছে। অতীতে যেভাবে ভাষা রক্ষার লড়াই, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন কিংবা কৃষকদের অধিকারের দাবি রাজপথ থেকে শাসনব্যবস্থাকে বাধ্য করেছিল পুনর্বিবেচনা করতে, ঠিক একইভাবে বর্তমান ভোটার তালিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার লড়াইটিও সেই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করছে। গণতন্ত্রের স্বার্থে নাগরিকের কণ্ঠরোধ করা যে সম্ভব নয়, ভারতের রাজপথ বারবার তা প্রমাণ করেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য

ভারতে অধিকারকর্মীদের এই আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক বিতর্ক বিশ্বমঞ্চেও গভীরভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক অধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো বারবার ভারতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং স্বাধীন নির্বাচনী কাঠামোর সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি অপরিহার্য কৌশলগত অংশীদার বিবেচনা করলেও, দেশটির ভেতরের গণতান্ত্রিক ক্ষয়িষ্ণুতা বা গণআন্দোলনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিক মহলে নিয়মিত আলোচনা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বরাজনীতিতে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে ভারতকে তার অন্তর্নিহিত বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। বৈশ্বিক অঙ্গনে ভারতের প্রভাব তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তার প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতা ও নাগরিক অসন্তোষ মোকাবিলার গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ওপরও বহুলাংশে নির্ভরশীল।

শেষ কথাঃ ভারতের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ কখনো রৈখিক বা নির্বিঘ্ন ছিল না; এটি গড়ে উঠেছে ধারাবাহিক সংঘাত, গণদাবি ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে। তামিলনাড়ুর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দিল্লির রাজপথে কৃষকদের ঐতিহাসিক অবস্থান কর্মসূচি প্রমাণ করে যে জনগণের প্রতিরোধ শক্তিই দেশটির নীতি নির্ধারণের ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে। বর্তমান সময়ে ভোটার তালিকা বা নির্বাচনী অধিকার নিয়ে চলা বিতর্কগুলোও সেই চিরন্তন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই অংশ। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে গণআন্দোলন কোনো বিশৃঙ্খলা নয়, বরং তা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সংবিধানের চেতনাকে জীবন্ত রাখার প্রধান সঞ্জীবনী শক্তি।

তথ্যসূত্রঃ Al Jazeera

Previous Post Next Post