কাজের সন্ধানে রাশিয়ায় এসে ইউক্রেনীয় হামলার শিকারে বিদেশি শ্রমিকরা
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন আর কেবল সম্মুখ সমরে সীমাবদ্ধ নেই। কিয়েভ প্রশাসনের দূরপাল্লার ড্রোন এবং নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত তেল শোধনাগার, জ্বালানি ডিপো, রাসায়নিক কারখানা ও লজিস্টিক গুদামগুলোতে আঘাত হানছে। এই সামরিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে পরিচালিত আকস্মিক হামলায় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ মর্মান্তিক বাস্তবতা সামনে এসেছে—হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন এবং মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছেন বিভিন্ন দেশ থেকে রাশিয়ায় পাড়ি জমানো বিদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা।
দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের ফলে রাশিয়া তীব্র শ্রমিক সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটির বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম পুরুষকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন কারখানায় স্থানান্তর করার কারণে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ করতে মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শ্রমিকদের কাজে লাগানো হচ্ছিল। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে কিংবা আর্থিক সচ্ছলতার আশায় রাশিয়ার শিল্পাঞ্চলে কাজ করতে আসা এই নিরীহ প্রবাসীরা এখন আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের সবচেয়ে অরক্ষিত শিকারে পরিণত হয়েছেন।
{getToc} $title={Table of Contents}ইউক্রেনের দূরপাল্লার আঘাত ও রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যবস্তু
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী তাদের রণকৌশলে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনা সক্ষমতা এবং প্রধান আয়ের উৎস তেল ও গ্যাস খাতকে পঙ্গু করে দিতে কিয়েভ রাশিয়ার সীমান্ত থেকে শত শত কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত শোধনাগার ও বাণিজ্যিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। রোস্তভ, ক্রাসনোদার, সামারা, রিয়াজান এমনকি তাতারস্তানের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিল্পাঞ্চলেও ড্রোন আছড়ে পড়ছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, এসব তেল শোধনাগার এবং গুদাম রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে সচল রাখার মূল চাবিকাঠি। ফলে এগুলোকে তারা বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু দৃশ্যপটের আড়ালে থাকা বাস্তবতা হলো, এসব জটিল ও সংবেদনশীল শিল্প স্থাপনায় কর্মরত সিংহভাগ নিম্ন ও মাঝারি স্তরের কর্মী হলেন সাধারণ অভিবাসী শ্রমিক, যাদের আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চরম ঝুঁকি সম্পর্কে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণ নেই।
রাশিয়ার যুদ্ধকালীন তীব্র শ্রম সংকট ও বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে। কয়েক লাখ রুশ নাগরিককে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, আবার সম্ভাব্য মোবিলাইজেশন বা বাধ্যতামূলক নিয়োগ এড়াতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন অসংখ্য তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবী। একই সাথে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প খাত তিন শিফটে কাজ শুরু করায় সেখানে লাখ লাখ অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দেয়।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে রাশিয়ার প্রচলিত বেসামরিক শিল্প, কৃষি, নির্মাণ এবং বিশেষ করে ভারী তেল-গ্যাস ও লজিস্টিকস খাতে তীব্র শ্রম ঘাটতি তৈরি হয়। মস্কো এই সংকট সামাল দিতে মধ্য এশিয়ার সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো—যেমন উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তানের পাশাপাশি কিউবা, নেপাল, ভারত ও আফ্রিকার কিছু দেশ থেকে বিপুল হারে শ্রমিক নিয়োগের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। আকর্ষণীয় বেতন ও রুশ নাগরিকত্ব লাভের সহজ শর্তের সুযোগ নিয়ে হাজার হাজার যুবক রাশিয়ার শিল্প কারখানাগুলোতে যোগ দেন।
কৌশলগত স্থাপনায় অভিবাসীদের ঝুঁকিপূর্ণ মোতায়েন
শিল্প স্থাপনাগুলোতে রুশ স্থানীয় কর্মীদের সংকট থাকায় বিদেশি শ্রমিকদের এমন সব স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে, যেগুলোর ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল। উদাহরণস্বরূপ, তাতারস্তানের আলাবুগা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো এলাকাগুলোতে, যেখানে একদিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলে এবং অন্যদিকে সামরিক ড্রোনের যন্ত্রাংশ তৈরি বা সংরক্ষণের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়া থেকে আনা তরুণ কর্মীদের চুক্তিভিত্তিক কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে।
তেল শোধনাগারগুলোতে যেখানে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ প্রক্রিয়া করা হয়, সেখানে সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজেও বহু অভিবাসী শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। যখনই ইউক্রেনীয় ড্রোন এসব শোধনাগারের ক্র্যাকিং ইউনিট বা রিজার্ভারে আঘাত হানে, তখন বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে প্রথম সারিতে থাকা এই শ্রমিকরাই সরাসরি হতাহত হচ্ছেন।
সুরক্ষাহীন জীবন ও মানবিক সংকট: চরম ঝুঁকিতে অভিবাসীরা
রাশিয়ার ভেতরে অবস্থানরত বিদেশি শ্রমিকদের বর্তমান অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এক ভয়াবহ বৈষম্য ও মানবিক সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে। ড্রোন হামলার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ বেসামরিক ও আধা-সামরিক গুদাম বা কারখানায় কোনো সুনির্দিষ্ট বোমা আশ্রয়কেন্দ্র (Bomb Shelter) নেই। অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রাথমিক সতর্কীকরণ সাইরেন বাজার আগেই ড্রোন আঘাত হানে, ফলে শ্রমিকরা আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ পান না।
তাছাড়া, বিদেশি শ্রমিকদের অনেকেই শিল্পাঞ্চলের ঠিক পাশেই অবস্থিত অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ ডরমিটরিতে বসবাস করেন। যখন একটি শিল্পাঞ্চলে হামলা হয়, তখন ডরমিটরিগুলোও বোমার স্প্লিন্টার কিংবা অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়। ভাষা ও আইনি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় আহত শ্রমিকরা স্থানীয় হাসপাতালে উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতেও নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক বাধার সম্মুখীন হন।
ক্ষতিপূরণ ও আইনি সুরক্ষার অনিশ্চয়তা
রুশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন কোনো হামলায় নিহত বা আহত হলে রাষ্ট্রীয় বিশেষ তহবিল বা বিমা থেকে পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তবে বিদেশি চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই অধিকারগুলো অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং প্রায়শই উপেক্ষিত। অধিকাংশ শ্রমিকের কর্মচুক্তি এমনভাবে তৈরি করা হয় যেখানে যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতি বা ড্রোন হামলার ক্ষতিপূরণের কোনো স্পষ্ট ধারা থাকে না।
ফলস্বরূপ, কোনো বিদেশি কর্মী নিহত হলে তার মৃতদেহ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং পরিবারের জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা এক দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো দায় এড়াতে ঘটনার দায়ভার এড়িয়ে যায়, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে চরম আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
পটভূমি: অর্থনৈতিক অভিবাসন থেকে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের ফাঁদ
ঐতিহাসিকভাবেই সোভিয়েত-উত্তর মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি বহুলাংশে রাশিয়ায় কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তানের মোট জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে রাশিয়া থেকে পাঠানো অর্থ থেকে। গৃহযুদ্ধ, দারিদ্র্য ও নিজ দেশে কর্মসংস্থানের তীব্র অভাবের কারণে লাখ লাখ যুবক রাশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিক বা ডেলিভারি কর্মী হিসেবে কাজ করতে যেতেন।
তবে চলমান যুদ্ধ এই সাধারণ অর্থনৈতিক অভিবাসনকে একটি বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদে পরিণত করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীগুলো অভিবাসীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। বিভিন্ন সময় পুলিশি তল্লাশির মাধ্যমে অভিবাসী তরুণদের সামরিক বাহিনীতে চুক্তি সই করতে চাপ প্রয়োগের বহু অভিযোগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। যারা সামরিক বাহিনীতে যাননি, তারাও বাড়তি উপার্জনের আশায় কৌশলগত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে কাজ করতে গিয়ে পরোক্ষভাবে যুদ্ধের শিকার হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ভেতরে বিদেশি নাগরিকদের হতাহতের ঘটনায় বিভিন্ন দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে তাদের নাগরিকদের রাশিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল ও সংবেদনশীল শিল্প স্থাপনাগুলোতে কাজ করার ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছে।
"যেসব তরুণ কেবল পরিবারকে দুবেলা অন্ন জোগাতে রাশিয়ার শিল্পাঞ্চলে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তারা আজ কোনো ধরনের কার্যকর নিরাপত্তা বলয় ছাড়াই আধুনিক রিমোট যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। এটি যুদ্ধ আইনের চরম জটিলতা এবং শ্রম শোষণের এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়।"
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো বারবার জোর দিয়ে বলছে যে, কোনো যুদ্ধরত রাষ্ট্র যখন বেসামরিক অভিবাসীদের কৌশলগত বা সংবেদনশীল শিল্পাঞ্চলে ব্যবহার করে, তখন তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সেই রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব। একইভাবে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় আক্রমণকারী পক্ষকেও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
এই চলমান সংকট রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমত, যদি ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার তেল ও লজিস্টিকস খাতকে অনিরাপদ মনে করে বিদেশি শ্রমিকরা দেশ ছাড়তে শুরু করেন, তবে মস্কোর শিল্পোৎপাদন এক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যুদ্ধকালীন অর্থনীতি ধরে রাখতে রাশিয়ার যে শ্রমশক্তি প্রয়োজন, তা কেবল অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কেও এর টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে যদি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার কঠোর অবস্থান নেয়, তবে রাশিয়াকে নতুন কোনো বিকল্প উৎস থেকে কর্মী সংগ্রহের পথ খুঁজতে হবে, যা বর্তমান বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার আবহে অত্যন্ত কঠিন।
শেষ কথাঃ ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাতের পরিধি দিন দিন যত বিস্তৃত হচ্ছে, যুদ্ধের আগুন ততই এমন সব মানুষের জীবন গ্রাস করছে যারা এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের অংশীদারই নন। কাজের সন্ধানে রাশিয়ায় পাড়ি জমানো অভিবাসী শ্রমিকরা আজ সেই নির্মম বাস্তবতার নীরব শিকার। অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের ক্রসফায়ারে পিষ্ট এই শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে এই মানবিক সংকট আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
তথ্যসূত্রঃ The New York Times